Thermosphere বা তাপমণ্ডল



থার্মোস্ফিয়ার (Thermosphere) বা তাপমণ্ডল হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের চতুর্থ স্তর, যা মেসোস্ফিয়ারের ঠিক ওপরে এবং এক্সোস্ফিয়ারের নিচে অবস্থিত। গ্রিক শব্দ "Thermos" এর অর্থ তাপ বা উষ্ণতা। এই স্তরের অত্যধিক তাপমাত্রার কারণেই এর এমন নামকরণ করা হয়েছে।

1. উচ্চতা ও সীমানা

ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 85 কিলোমিটার উচ্চতায় শুরু হয়ে প্রায় 600 কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। নিচের সীমানাকে মেসোপজ (Mesopause) এবং উপরের সীমানাকে থার্মোপজ (Thermopause) বলা হয়।

2. প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

চরম তাপমাত্রা

থার্মোস্ফিয়ারে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সূর্যের উচ্চ-শক্তির অতিবেগুনি (UV) এবং এক্স-রে (X-ray) রশ্মি গ্যাসীয় অণু দ্বারা শোষিত হওয়ার ফলে তাপমাত্রা 1000°C থেকে 2000°C পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

মজার তথ্য: এখানে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি হলেও আপনি সেখানে গেলে ঠান্ডা অনুভব করবেন, কারণ বাতাস এতটাই পাতলা যে তাপ পরিবহন করার মতো পর্যাপ্ত গ্যাসীয় অণু নেই।

আয়নোস্ফিয়ার (Ionosphere)

থার্মোস্ফিয়ারের নিচের অংশ (প্রায় 80–400 কিমি) কে আয়নোস্ফিয়ার বলা হয়। সূর্যের তীব্র বিকিরণের প্রভাবে এখানে গ্যাসীয় পরমাণুগুলো আয়নে পরিণত হয়। এই স্তর পৃথিবীর রেডিও তরঙ্গ প্রতিফলিত করে দূরপাল্লার যোগাযোগে সাহায্য করে।

মেরুজ্যোতি বা অরোরা (Aurora)

থার্মোস্ফিয়ারেই পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক ঘটনা মেরুজ্যোতি (Aurora) দেখা যায়। উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে আকাশে যে সবুজ, লাল বা বেগুনি রঙের আলোর খেলা দেখা যায় (যাকে অরোরা বোরিয়ালিস এবং অরোরা অস্ট্রালিস বলা হয়), তা এই থার্মোস্ফিয়ারেই তৈরি হয়। সূর্য থেকে আসা চার্জিত কণা যখন এই স্তরের গ্যাসীয় অণুর সাথে ধাক্কা খায়, তখন এই আলোকরশ্মি সৃষ্টি হয়।

অরোরা কীভাবে তৈরি হয়?

অরোরা তৈরি হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি একটি মহাজাগতিক বিক্রিয়া, যার পেছনে মূল ভূমিকা রয়েছে সূর্যের। এটি মূলত তিনটি ধাপে ঘটে:

1. সৌরঝড় ও চার্জিত কণা: সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত চারদিকে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন চার্জিত কণার (যেমন- ইলেকট্রন ও প্রোটন) স্রোত ভেসে আসে, যাকে সৌরবায়ু (Solar Wind) বলা হয়। মাঝে মাঝে সূর্য থেকে তীব্র সৌরঝড় বা 'করোনাল মাস ইজেকশন' (CME) ঘটলে এই কণার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।

2. পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র: এই ক্ষতিকর কণাগুলো যখন পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তখন পৃথিবীর শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field) বা ম্যাগনেটোস্ফিয়ার ঢাল হিসেবে কাজ করে আমাদের রক্ষা করে। চৌম্বক ক্ষেত্রের বলরেখাগুলো উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে গিয়ে শেষ হওয়ায়, এই চার্জিত কণাগুলোও চৌম্বক শক্তির টানে দুই মেরুর দিকে ধাবিত হয়।

3. বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সাথে সংঘর্ষ: মেরু অঞ্চলে পৌঁছানোর পর এই চার্জিত কণাগুলো বায়ুমণ্ডলের থার্মোস্ফিয়ার স্তরে থাকা গ্যাসীয় অণু ও পরমাণুর (প্রধানত অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন) সাথে তীব্র গতিতে ধাক্কা খায়। এই সংঘর্ষের ফলে গ্যাসীয় পরমাণুগুলো উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং শক্তি ছেড়ে দেওয়ার সময় আলোকরশ্মি নির্গত করে। কোটি কোটি পরমাণুর এই আলো একসাথে মিলে আকাশে অরোরার সৃষ্টি করে।

অরোরার বিভিন্ন রঙের রহস্য

রঙ কারণ
সবুজ ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 100 থেকে 240 কিলোমিটার উচ্চতায় যখন সৌরকণা অক্সিজেন পরমাণুর সাথে ধাক্কা খায়, তখন উজ্জ্বল সবুজ আলোর সৃষ্টি হয়।
লাল প্রায় ২৪০ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি উচ্চতায় (একেবারে থার্মোস্ফিয়ারের ওপরের দিকে) কম ঘনত্বের অক্সিজেন পরমাণুর সাথে সংঘর্ষ হলে গাঢ় লাল রঙের অরোরা তৈরি হয়।
নীল ও বেগুনি বায়ুমণ্ডলের নিচের দিকে যখন সৌরকণা নাইট্রোজেন অণুর সাথে ধাক্কা খায়, তখন বেগুনি বা নীল রঙের আলো দেখা যায়।
মজার তথ্য: অরোরা কেবল পৃথিবীতেই নয়, যেসব গ্রহের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বায়ুমণ্ডল রয়েছে—যেমন বৃহস্পতি (Jupiter) ও শনি (Saturn) গ্রহেও অত্যন্ত শক্তিশালী অরোরা বা মেরুজ্যোতি তৈরি হয়।

৩. মানব সভ্যতায় থার্মোস্ফিয়ারের গুরুত্ব

  • আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (International Space Station) এবং পৃথিবীর নিচু কক্ষপথের (Low Earth Orbit) বহু কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট এই থার্মোস্ফিয়ার স্তরের মধ্য দিয়েই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। এখানকার বাতাস অত্যন্ত পাতলা হওয়ায় স্যাটেলাইটগুলো কোনো বাধা ছাড়াই সহজে ঘুরতে পারে।
  • সূর্যের ক্ষতিকর UV ও X-ray বিকিরণ শোষণ করে পৃথিবীকে সুরক্ষা দেয়।
  • রেডিও যোগাযোগ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • মহাকাশ গবেষণা ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

থার্মোস্ফিয়ার (Thermosphere) MCQ Questions

  1. থার্মোস্ফিয়ার বায়ুমণ্ডলের কোন স্তর?
    A) প্রথম
    B) দ্বিতীয়
    C) তৃতীয়
    D) চতুর্থ
    উত্তর: D) চতুর্থ

  2. থার্মোস্ফিয়ার কোন দুটি স্তরের মধ্যে অবস্থিত?
    A) ট্রপোস্ফিয়ার ও স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার
    B) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার ও মেসোস্ফিয়ার
    C) মেসোস্ফিয়ার ও এক্সোস্ফিয়ার
    D) এক্সোস্ফিয়ার ও আয়নোস্ফিয়ার
    উত্তর: C) মেসোস্ফিয়ার ও এক্সোস্ফিয়ার

  3. থার্মোস্ফিয়ার সাধারণত কত কিমি উচ্চতা থেকে শুরু হয়?
    A) 50 কিমি
    B) 85 কিমি
    C) 120 কিমি
    D) 500 কিমি
    উত্তর: B) 85 কিমি

  4. থার্মোস্ফিয়ারের উপরের সীমানাকে কী বলা হয়?
    A) স্ট্র্যাটোপজ
    B) মেসোপজ
    C) থার্মোপজ
    D) এক্সোপজ
    উত্তর: C) থার্মোপজ

  5. থার্মোস্ফিয়ারের নিচের সীমানার নাম কী?
    A) ট্রপোপজ
    B) স্ট্র্যাটোপজ
    C) মেসোপজ
    D) থার্মোপজ
    উত্তর: C) মেসোপজ

  6. থার্মোস্ফিয়ারে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ কী?
    A) জলীয় বাষ্প
    B) কার্বন ডাই অক্সাইড
    C) UV ও X-ray রশ্মি শোষণ
    D) ধূলিকণা
    উত্তর: C) UV ও X-ray রশ্মি শোষণ

  7. থার্মোস্ফিয়ারের তাপমাত্রা কত পর্যন্ত হতে পারে?
    A) 100°C
    B) 500°C
    C) 1000°C–2000°C বা তারও বেশি
    D) 50°C
    উত্তর: C) 1000°C–2000°C বা তারও বেশি

  8. থার্মোস্ফিয়ারের একটি অংশকে কী বলা হয়?
    A) ওজোনোস্ফিয়ার
    B) আয়নোস্ফিয়ার
    C) বায়োস্ফিয়ার
    D) হাইড্রোস্ফিয়ার
    উত্তর: B) আয়নোস্ফিয়ার

  9. আয়নোস্ফিয়ার রেডিও যোগাযোগে সাহায্য করে কারণ এটি—
    A) আলো প্রতিফলিত করে
    B) শব্দ শোষণ করে
    C) রেডিও তরঙ্গ প্রতিফলিত করে
    D) মেঘ সৃষ্টি করে
    উত্তর: C) রেডিও তরঙ্গ প্রতিফলিত করে

  10. অরোরা কোন স্তরে সৃষ্টি হয়?
    A) ট্রপোস্ফিয়ার
    B) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার
    C) মেসোস্ফিয়ার
    D) থার্মোস্ফিয়ার
    উত্তর: D) থার্মোস্ফিয়ার

  11. উত্তর গোলার্ধে অরোরাকে কী বলা হয়?
    A) Aurora Australis
    B) Aurora Borealis
    C) Solar Flare
    D) Magnetosphere
    উত্তর: B) Aurora Borealis

  12. অরোরার সবুজ রঙের জন্য প্রধানত কোন গ্যাস দায়ী?
    A) নাইট্রোজেন
    B) হিলিয়াম
    C) অক্সিজেন
    D) হাইড্রোজেন
    উত্তর: C) অক্সিজেন

  13. আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) প্রধানত কোন স্তরে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে?
    A) ট্রপোস্ফিয়ার
    B) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার
    C) থার্মোস্ফিয়ার
    D) এক্সোস্ফিয়ার
    উত্তর: C) থার্মোস্ফিয়ার

  14. নিচের কোনটি থার্মোস্ফিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ?
    A) বৃষ্টিপাত ঘটানো
    B) ওজোন সৃষ্টি করা
    C) সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণ শোষণ করা
    D) মেঘ তৈরি করা
    উত্তর: C) সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণ শোষণ করা

Assertion – Reason MCQ

নির্দেশ:
A) Assertion ও Reason উভয়ই সত্য এবং Reason হলো Assertion-এর সঠিক ব্যাখ্যা।
B) Assertion ও Reason উভয়ই সত্য কিন্তু Reason সঠিক ব্যাখ্যা নয়।
C) Assertion সত্য কিন্তু Reason মিথ্যা।
D) Assertion মিথ্যা কিন্তু Reason সত্য।
  1. Assertion (A): থার্মোস্ফিয়ারে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি।
    Reason (R): এখানে সূর্যের UV ও X-ray রশ্মি গ্যাসীয় অণু দ্বারা শোষিত হয়।
    উত্তর: A

  2. Assertion (A): আয়নোস্ফিয়ার দূরপাল্লার রেডিও যোগাযোগে সাহায্য করে।
    Reason (R): আয়নোস্ফিয়ার রেডিও তরঙ্গ প্রতিফলিত করতে পারে।
    উত্তর: A
  1. থার্মোস্ফিয়ারে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি হলেও একজন মানুষ সেখানে ঠান্ডা অনুভব করবে, কারণ—
    A) সূর্যালোক সেখানে পৌঁছায় না
    B) সেখানে মাধ্যাকর্ষণ নেই
    C) বায়ুর ঘনত্ব অত্যন্ত কম
    D) সেখানে শুধুমাত্র আয়ন থাকে
    উত্তর: C) বায়ুর ঘনত্ব অত্যন্ত কম

  2. নিম্নলিখিত কোন ঘটনাটি সরাসরি থার্মোস্ফিয়ারের সাথে সম্পর্কিত নয়?
    A) Aurora Borealis
    B) Radio Wave Reflection
    C) ISS Orbit
    D) Ozone Layer Maximum Concentration
    উত্তর: D) Ozone Layer Maximum Concentration

  3. আয়নোস্ফিয়ারে গ্যাসীয় পরমাণু আয়নে পরিণত হওয়ার প্রধান কারণ—
    A) পৃথিবীর ঘূর্ণন
    B) মহাকর্ষীয় আকর্ষণ
    C) সূর্যের উচ্চ-শক্তির বিকিরণ
    D) বায়ুচাপের পরিবর্তন
    উত্তর: C) সূর্যের উচ্চ-শক্তির বিকিরণ