জোয়ার-ভাটা শক্তি

জোয়ার-ভাটা শক্তি (Tidal Energy)

জোয়ার-ভাটা শক্তি (Tidal Energy) হলো সমুদ্রের জলের পর্যায়ক্রমিক উত্থান ও পতনকে—অর্থাৎ জোয়ার ও ভাটাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত এক প্রকার নবায়নযোগ্য বা অক্ষয় শক্তি (Renewable Energy)। চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় টান এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে সমুদ্রে প্রতিদিন যে জোয়ার-ভাটা হয়, তার জলস্রোতের গতিশক্তিকে (Kinetic Energy) এখানে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করা হয়।

নিচে জোয়ার-ভাটা শক্তির কার্যপদ্ধতি ও এর বিভিন্ন দিক সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো:

1. জোয়ার-ভাটা শক্তি কীভাবে কাজ করে?

সমুদ্রের উপকূলবর্তী এলাকায় বা নদীর মোহনায় যেখানে জোয়ার-ভাটার সময় জলের উচ্চতার পার্থক্য অনেক বেশি হয়, সেখানে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্থাপন করা হয়। এটি মূলত দুটি প্রধান উপায়ে কাজ করে:

1. জলাধারে জল প্রবেশ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন:

ধাপ 1: জোয়ারের সময় (Flood Tide)

যখন জোয়ার আসে, তখন সমুদ্রের জলের উচ্চতা বেড়ে যায়। এই সময় বাঁধের (Sluice gates) গেট খুলে দেওয়া হয়, যার ফলে সমুদ্রের জল তীব্র বেগে ভেতরের কৃত্রিম জলাধারে প্রবেশ করে। এই জলপ্রবাহের মুখে থাকা টারবাইনটি ঘুরতে শুরু করে এবং জেনারেটরের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

2. গেট বন্ধ ও জল আটকে রাখা:

ধাপ ২: জলের সর্বোচ্চ স্তর

জলাধারটি যখন পুরোপুরি জলে ভরে যায় এবং জোয়ারের বেগ কমে আসে, তখন বাঁধের গেটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে জলাধারের জল আটকে পড়ে এবং সমুদ্রের জলস্তর আস্তে আস্তে নামতে শুরু করে।

3. জল নিষ্কাশন ও পুনরায় বিদ্যুৎ উৎপাদন:

ধাপ 3: ভাটার সময় (Ebb Tide)

সমুদ্রে যখন পুরোপুরি ভাটা নেমে আসে এবং সমুদ্রের জলস্তর অনেক নিচে নেমে যায়, তখন বাঁধের গেট আবার খুলে দেওয়া হয়। এবার জলাধারের আটকে থাকা জল তীব্র বেগে পুনরায় সমুদ্রের দিকে ফিরে যায়। এই বিপরীতমুখী জলস্রোতের ধাক্কায় টারবাইনটি আবারও ঘোরে এবং দ্বিতীয়বার বিদ্যুৎ তৈরি হয়।

নোট: নিচের চিত্রটি দেখলে জোয়ার ও ভাটা—উভয় অবস্থায় টারবাইন কীভাবে ঘোরে তা সহজে বুঝতে পারবেন।

2. জোয়ার-ভাটা শক্তির সুবিধা ও অসুবিধা
সুবিধা (Advantages) অসুবিধা (Disadvantages)
শতভাগ নির্ভরযোগ্য: আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, জোয়ার-ভাটা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে আসবেই। তাই এর পূর্বাভাস দেওয়া খুব সহজ। উচ্চ প্রাথমিক খরচ: সমুদ্রের নোনা জলে টিকে থাকার মতো শক্তিশালী বাঁধ এবং টারবাইন তৈরি করতে প্রচুর খরচ হয়।
দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো: একটি জোয়ার-ভাটা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা ব্যারেজ প্রায় 70 থেকে 100 বছর পর্যন্ত অনায়াসে বিদ্যুৎ দিতে পারে। উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি: বাঁধ তৈরির ফলে সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য প্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয় এবং নদীর মোহনার পলি জমার প্রাকৃতিক নিয়ম বদলে যায়।
সবুজ শক্তি: জলবিদ্যুৎ বা বায়ুশক্তির মতোই এতে কোনো জ্বালানি পোড়াতে হয় না এবং কার্বন নির্গমন শূন্য। সীমিত ভৌগোলিক অবস্থান: সব সমুদ্র উপকূলে জোয়ার-ভাটার তীব্রতা এক থাকে না। যেখানে জলের উচ্চতার পার্থক্য অন্তত ৫ মিটার (প্রায় 16 ফুট) বা বেশি, শুধু সেখানেই এটি সম্ভব।

পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের প্রেক্ষাপট

ভারতের মধ্যে গুজরাটের কচ্ছ উপসাগর (Gulf of Kutch) এবং খাম্বাত উপসাগরে জোয়ার-ভাটা শক্তির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আমাদের পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চলে (যেমন দুর্গাদুয়ানি খাঁড়িতে) এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ও গবেষণা করা হয়েছে।

MCQ

1. জোয়ার-ভাটা শক্তি কোন ধরনের শক্তির উৎস?

A) জীবাশ্ম জ্বালানি
B) অনবায়নযোগ্য শক্তি
C) নবায়নযোগ্য শক্তি
D) পারমাণবিক শক্তি

উত্তর: C) নবায়নযোগ্য শক্তি


2. জোয়ার-ভাটা মূলত কোন দুই মহাজাগতিক বস্তুর মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে সৃষ্টি হয়?

A) পৃথিবী ও মঙ্গল
B) চাঁদ ও সূর্য
C) সূর্য ও শুক্র
D) চাঁদ ও বৃহস্পতি

উত্তর: B) চাঁদ ও সূর্য


3. জোয়ার-ভাটা শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রধানত কী ব্যবহার করা হয়?

A) সৌর প্যানেল
B) বায়ু টারবাইন
C) জলের প্রবাহ
D) ব্যাটারি

উত্তর: C) জলের প্রবাহ


4. জোয়ারের সময় সমুদ্রের জলের স্তর কী হয়?

A) কমে যায়
B) অপরিবর্তিত থাকে
C) বেড়ে যায়
D) শুকিয়ে যায়

উত্তর: C) বেড়ে যায়


5. ভাটার সময় সমুদ্রের জলের স্তর কী হয়?

A) বেড়ে যায়
B) কমে যায়
C) অপরিবর্তিত থাকে
D) বাষ্পীভূত হয়

উত্তর: B) কমে যায়


6. জোয়ার-ভাটা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে টারবাইনের কাজ কী?

A) জল সংরক্ষণ করা
B) জলের শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করা
C) বিদ্যুৎ সঞ্চয় করা
D) ভোল্টেজ বৃদ্ধি করা

উত্তর: B) জলের শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করা


7. জেনারেটরের কাজ কী?

A) যান্ত্রিক শক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তর করা
B) জলাধার তৈরি করা
C) জল শোধন করা
D) গেট নিয়ন্ত্রণ করা

উত্তর: A) যান্ত্রিক শক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তর করা


8. Tidal Barrage বলতে কী বোঝায়?

A) বায়ু টারবাইন
B) সৌর প্যানেল
C) সমুদ্র মোহনায় নির্মিত বাঁধ
D) জলাধার

উত্তর: C) সমুদ্র মোহনায় নির্মিত বাঁধ


9. Sluice Gate-এর কাজ কী?

A) বিদ্যুৎ উৎপাদন
B) জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ
C) ভোল্টেজ বৃদ্ধি
D) জল সংরক্ষণ

উত্তর: B) জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ


10. জোয়ার-ভাটা শক্তির একটি প্রধান সুবিধা হলো—

A) এটি প্রচুর দূষণ সৃষ্টি করে
B) এটি অনির্ভরযোগ্য
C) এর পূর্বাভাস সহজ
D) এটি শুধুমাত্র দিনে কাজ করে

উত্তর: C) এর পূর্বাভাস সহজ


11. জোয়ার-ভাটা শক্তি উৎপাদনের সময় কার্বন নির্গমন—

A) অত্যন্ত বেশি
B) মাঝারি
C) খুব কম বা প্রায় শূন্য
D) কয়লার সমান

উত্তর: C) খুব কম বা প্রায় শূন্য


12. জোয়ার-ভাটা শক্তির একটি অসুবিধা কী?

A) নবায়নযোগ্য শক্তি
B) উচ্চ প্রাথমিক খরচ
C) দূষণমুক্ত
D) দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো

উত্তর: B) উচ্চ প্রাথমিক খরচ


13. জোয়ার-ভাটা শক্তি উৎপাদনের জন্য কোন স্থান সবচেয়ে উপযুক্ত?

A) মরুভূমি
B) পাহাড়ি অঞ্চল
C) সমুদ্র উপকূল ও মোহনা
D) বনাঞ্চল

উত্তর: C) সমুদ্র উপকূল ও মোহনা


14. ভারতে জোয়ার-ভাটা শক্তির সম্ভাবনাময় অঞ্চল কোনটি?

A) থার মরুভূমি
B) কচ্ছ উপসাগর
C) দাক্ষিণাত্য মালভূমি
D) নীলগিরি পাহাড়

উত্তর: B) কচ্ছ উপসাগর


15. জোয়ার-ভাটা শক্তির মূল উৎস হলো—

A) ভূ-তাপীয় শক্তি
B) মহাকর্ষীয় শক্তি
C) রাসায়নিক শক্তি
D) তাপশক্তি

উত্তর: B) মহাকর্ষীয় শক্তি


16. জোয়ার-ভাটা শক্তিতে টারবাইন ঘোরানোর জন্য ব্যবহৃত হয়—

A) বাষ্প
B) বায়ু
C) জলের গতিশক্তি
D) সূর্যালোক

উত্তর: C) জলের গতিশক্তি


17. Tidal Energy-এর ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন সাধারণত কখন সম্ভব?

A) শুধু জোয়ারের সময়
B) শুধু ভাটার সময়
C) জোয়ার ও ভাটা উভয় সময়
D) শুধুমাত্র দিনে

উত্তর: C) জোয়ার ও ভাটা উভয় সময়


18. জোয়ার-ভাটা শক্তি প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাবের মধ্যে অন্যতম হলো—

A) বায়ুদূষণ বৃদ্ধি
B) সামুদ্রিক জীবের চলাচলে বাধা
C) অ্যাসিড বৃষ্টি
D) ওজোন স্তর ধ্বংস

উত্তর: B) সামুদ্রিক জীবের চলাচলে বাধা


19. কার্যকর জোয়ার-ভাটা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সাধারণত জলের উচ্চতার পার্থক্য কমপক্ষে কত হওয়া প্রয়োজন?

A) ১ মিটার
B) ২ মিটার
C) ৩ মিটার
D) প্রায় ৫ মিটার বা তার বেশি

উত্তর: D) প্রায় ৫ মিটার বা তার বেশি