ওজোনস্তর (Ozone Layer)
ওজোনস্তর (Ozone Layer) ও এর ক্ষয়ের রাসায়নিক রহস্য
ওজোনস্তর (Ozone Layer) হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার (Stratosphere) স্তরে অবস্থিত একটি বিশেষ অঞ্চল, যেখানে ওজোন (O₃) গ্যাসের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। এই স্তর সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর অতিবেগুনি (Ultraviolet বা UV) রশ্মির অধিকাংশ শোষণ করে পৃথিবীর জীবজগতকে রক্ষা করে。
■ওজোনগ্যাস কীভাবে তৈরি হয়?
ওজোনগ্যাসের একটি অণু অক্সিজেনের তিনটি পরমাণু নিয়ে গঠিত (O₃)। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে এটি একটি প্রাকৃতিক চক্রের মাধ্যমে অনবরত তৈরি ও ভেঙে যায়:
- প্রথম ধাপ: সূর্যের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অতিবেগুনি রশ্মি সাধারণ অক্সিজেন অণুকে (O₂) ভেঙে দুটি আলাদা অক্সিজেন পরমাণুতে (O + O) পরিণত করে।
- দ্বিতীয় ধাপ: এই মুক্ত অক্সিজেন পরমাণুগুলো অন্য সাধারণ অক্সিজেন অণুর সাথে যুক্ত হয়ে ওজোন (O₃) গঠন করে।
[অতিবেগুনি রশ্মি]
■ওজোনস্তরের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
ওজোনস্তরটি সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি (Ultraviolet Radiation বা UV-B এবং UV-C) প্রায় 97% থেকে 99% শোষণ করে নেয়। ওজোন স্তর না থাকলে পৃথিবীতে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিত:
- মানুষের স্বাস্থ্য: অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি গায়ে লাগলে মানুষের ত্বকের ক্যানসার, চোখে ছানি পড়া এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যেত।
- উদ্ভিদ ও কৃষি: ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো এবং উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
- সামুদ্রিক জীবন: সমুদ্রের উপরিভাগের ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (এককোষী উদ্ভিদ, যা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের মূল ভিত্তি) ধ্বংস হয়ে যেত, যার ফলে সমস্ত সামুদ্রিক মাছ ও প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটে পড়ত।
■ওজোনস্তরের ক্ষয় এবং "ওজোন ছিদ্র" (Ozone Hole)
1970 ও 1980-এর দশকে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে মানুষের তৈরি কিছু ক্ষতিকারক রাসায়নিকের কারণে ওজোন স্তর পাতলা হয়ে যাচ্ছে। যেমন—
- CFCs
(Chlorofluorocarbons)
- Halons
- Carbon
Tetrachloride
- Methyl
Chloroform
এই
গ্যাসগুলো থেকে উৎপন্ন ক্লোরিন
ও ব্রোমিন ওজোন অণু ধ্বংস
করে।
- এর মধ্যে প্রধান অপরাধী হলো CFC বা Chlorofluorocarbon (CFCl₃)গ্যাস, যা রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার (AC) এবং অ্যারোসল স্প্রে-তে ব্যবহৃত হতো।
- CFC বাতাস থেকে ওপরে উঠে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছালে সূর্যের আলোয় ভেঙে গিয়ে ক্লোরিন পরমাণু মুক্ত করে। এই একটি ক্লোরিন পরমাণু প্রায় 1,00,000 ওজোন অণুকে ধ্বংস করতে পারে।
স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) কীভাবে সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে ওজোন অণুকে ধ্বংস করে, তা ধাপে ধাপে নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
প্রথম ধাপ: ক্লোরিন পরমাণুর মুক্তি (Photodissociation)
যখন CFC গ্যাস (CFCl₃) বাতাস থেকে ওপরে উঠে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছায়, তখন সূর্যের তীব্র উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অতিবেগুনি রশ্মি (UV-C) এর ওপর আঘাত করে। এই অতিবেগুনি রশ্মির শক্তিতে CFC অণুর একটি কার্বন-ক্লোরিন (C-Cl) বন্ধন ভেঙে যায় এবং একটি অত্যন্ত সক্রিয় মুক্ত ক্লোরিন পরমাণু (Cl) তৈরি হয়।
[UV Light]
দ্বিতীয় ধাপ: ওজোন ধ্বংস ও ক্লোরিন মনোক্সাইড গঠন
এই মুক্ত ক্লোরিন পরমাণুটি (Cl) একটি ওজোন অণুর (O₃) সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ক্লোরিন ওজোন অণু থেকে একটি oxygen পরমাণুকে ছিনিয়ে নিয়ে ক্লোরিন মনোক্সাইড (ClO) এবং একটি সাধারণ অক্সিজেন অণু (O₂) তৈরি করে।
তৃতীয় ধাপ: ক্লোরিন পরমাণুর পুনরুৎপাদন (The Catalytic Cycle)
স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে অতিবেগুনি রশ্মির কারণে সাধারণ অক্সিজেন অণু ভেঙে কিছু মুক্ত অক্সিজেন পরমাণু (O) অনবরত তৈরি হতে থাকে। দ্বিতীয় ধাপে তৈরি হওয়া ক্লোরিন মনোক্সাইড (ClO) যখন এইরকম একটি মুক্ত অক্সিজেন পরমাণুর (O) মুখোমুখি হয়, তখন অক্সিজেন পরমাণুটি ক্লোরিনকে তাড়িয়ে নিজে যুক্ত হয়ে যায়। এর ফলে আবার একটি সাধারণ অক্সিজেন অণু (O₂) তৈরি হয় এবং ক্লোরিন পরমাণুটি (Cl) আবার একা ও মুক্ত হয়ে যায়।
■ 1 লক্ষ ওজোন অণু ধ্বংস হওয়ার রহস্য (Catalytic Chain Reaction)
ওপরের ৩ নম্বর বিক্রিয়াটি খেয়াল করলে দেখা যাবে, যে ক্লোরিন পরমাণুটি (1 নম্বর ধাপে) ওজোন ধ্বংস করা শুরু করেছিল, 3 নম্বর ধাপের শেষে এসে সেটি আবার অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছে।
যেহেতু ক্লোরিন পরমাণুটি নিজে এই বিক্রিয়ায় স্থায়ীভাবে খরচ হয়ে যাচ্ছে না, তাই এটি একটি অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট (Catalytic Agent) হিসেবে কাজ করে। মুক্ত হওয়া এই ক্লোরিন পরমাণুটি পুনরায় আরেকটি ওজোন অণুকে আক্রমণ করে (Cl + O₃)।
এই চক্রটি (Cycle) অবিরত চলতেই থাকে:
এই চক্রাকার বিক্রিয়াটি এতটাই দ্রুত এবং শক্তিশালী যে, বাতাস থেকে অন্য কোনো রাসায়নিক এসে ক্লোরিনকে নিষ্ক্রিয় করার বা স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার থেকে নিচে নামিয়ে আনার আগে, একটি মাত্র ক্লোরিন পরমাণু প্রায় 1,০০,০০০ (এক লক্ষ) ওজোন অণুকে ভেঙে সাধারণ অক্সিজেনে রূপান্তরিত করে দিতে পারে। ওজোন স্তরের এই ধ্বংসাত্মক চক্রকেই ওজোন ক্ষয়ের ক্যাটালিটিক চক্র বলা হয়।
ওজোন স্তরকে বাঁচাতে 1987 সালে আন্তর্জাতিকভাবে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা মনট্রিল প্রোটোকল (Montreal Protocol) নামে পরিচিত। এই চুক্তির অধীনে বিশ্বজুড়ে সিএফসি (CFC) গ্যাসের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।
ওজোন স্তর (Ozone Layer) MCQ Questions
সাধারণ MCQ
-
ওজোন স্তর প্রধানত বায়ুমণ্ডলের কোন স্তরে অবস্থিত?
A) ট্রপোস্ফিয়ার
B) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার
C) মেসোস্ফিয়ার
D) থার্মোস্ফিয়ার
উত্তর: B) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার -
ওজোন গ্যাসের রাসায়নিক সংকেত কী?
A) O₂
B) O₄
C) O₃
D) CO₂
উত্তর: C) O₃ -
একটি ওজোন অণুতে কয়টি অক্সিজেন পরমাণু থাকে?
A) ১টি
B) ২টি
C) ৩টি
D) ৪টি
উত্তর: C) ৩টি -
ওজোন স্তরকে পৃথিবীর কী বলা হয়?
A) শক্তিকেন্দ্র
B) প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ
C) জলাধার
D) তাপ উৎস
উত্তর: B) প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ -
ওজোন স্তর সূর্যের কোন ক্ষতিকর রশ্মি শোষণ করে?
A) ইনফ্রারেড রশ্মি
B) গামা রশ্মি
C) অতিবেগুনি (UV) রশ্মি
D) দৃশ্যমান আলো
উত্তর: C) অতিবেগুনি (UV) রশ্মি -
ওজোন স্তর সাধারণত কত উচ্চতায় সর্বাধিক ঘনত্বে পাওয়া যায়?
A) 5–10 কিমি
B) 15–35 কিমি
C) 50–80 কিমি
D) 100–200 কিমি
উত্তর: B) 15–35 কিমি -
নিচের কোন UV রশ্মি ওজোন স্তর প্রায় সম্পূর্ণ শোষণ করে?
A) UV-A
B) UV-B
C) UV-C
D) দৃশ্যমান আলো
উত্তর: C) UV-C -
ওজোন স্তর সূর্যের UV-B এবং UV-C রশ্মির প্রায় কত শতাংশ শোষণ করে?
A) ২৫%–৩০%
B) ৫০%–৬০%
C) ৭০%–৮০%
D) ৯৭%–৯৯%
উত্তর: D) ৯৭%–৯৯% -
ওজোন স্তর না থাকলে মানুষের কোন রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে?
A) ডায়াবেটিস
B) ত্বকের ক্যান্সার
C) ম্যালেরিয়া
D) টাইফয়েড
উত্তর: B) ত্বকের ক্যান্সার -
ওজোন স্তর উদ্ভিদের কোন প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখে?
A) শ্বসন
B) বাষ্পমোচন
C) সালোকসংশ্লেষ
D) অঙ্কুরোদ্গম
উত্তর: C) সালোকসংশ্লেষ -
নিচের কোন গ্যাস ওজোন স্তরের ক্ষয়ের প্রধান কারণ?
A) অক্সিজেন
B) নাইট্রোজেন
C) ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC)
D) হিলিয়াম
উত্তর: C) ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) -
CFC-এর পূর্ণরূপ কী?
A) Carbon Fluoride Compound
B) Chlorofluorocarbon
C) Chlorine Fluoride Carbon
D) Carbon Free Chloride
উত্তর: B) Chlorofluorocarbon -
স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে CFC ভেঙে কোন সক্রিয় পরমাণু মুক্ত করে?
A) অক্সিজেন
B) নাইট্রোজেন
C) ক্লোরিন
D) হাইড্রোজেন
উত্তর: C) ক্লোরিন -
নিচের কোন বিক্রিয়ায় ওজোন ধ্বংস হয়?
A) O + O₂ → O₃
B) Cl + O₃ → ClO + O₂
C) O₂ → O + O
D) N₂ + O₂ → NO₂
উত্তর: B) Cl + O₃ → ClO + O₂ -
একটি ক্লোরিন পরমাণু প্রায় কতটি ওজোন অণু ধ্বংস করতে পারে?
A) 100
B) 1,000
C) 10,000
D) 1,00,000
উত্তর: D) 1,00,000 -
ওজোন স্তরের অতিরিক্ত ক্ষয়প্রাপ্ত অঞ্চলকে কী বলা হয়?
A) ওজোন চক্র
B) ওজোন গহ্বর (Ozone Hole)
C) ওজোন বলয়
D) ওজোন মেঘ
উত্তর: B) ওজোন গহ্বর (Ozone Hole) -
সবচেয়ে বড় ওজোন গহ্বর কোথায় দেখা যায়?
A) আর্কটিক মহাসাগর
B) সাহারা মরুভূমি
C) অ্যান্টার্কটিকা
D) প্রশান্ত মহাসাগর
উত্তর: C) অ্যান্টার্কটিকা -
ওজোন স্তর রক্ষার জন্য কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়?
A) Kyoto Protocol
B) Paris Agreement
C) Montreal Protocol
D) Geneva Convention
উত্তর: C) Montreal Protocol
Assertion – Reason MCQ
A) Assertion ও Reason উভয়ই সত্য এবং Reason হলো Assertion-এর সঠিক ব্যাখ্যা।
B) Assertion ও Reason উভয়ই সত্য কিন্তু Reason সঠিক ব্যাখ্যা নয়।
C) Assertion সত্য কিন্তু Reason মিথ্যা।
D) Assertion মিথ্যা কিন্তু Reason সত্য।
-
Assertion (A): ওজোন স্তর পৃথিবীর জীবজগতকে রক্ষা করে।
Reason (R): এটি সূর্যের ক্ষতিকর UV রশ্মি শোষণ করে।
উত্তর: A -
Assertion (A): CFC ওজোন স্তরের ক্ষয় ঘটায়।
Reason (R): CFC থেকে মুক্ত ক্লোরিন পরমাণু ওজোনকে ধ্বংস করে।
উত্তর: A
-
ওজোন গঠনের সঠিক ধাপ কোনটি?
A) O₂ → O₃ → O
B) O + O → O₂
C) O₂ → O + O, তারপর O + O₂ → O₃
D) O₃ → O₂ + O
উত্তর: C -
নিচের কোনটি ওজোন স্তরের ক্ষয়ের ক্যাটালিটিক চক্রের বৈশিষ্ট্য?
A) ক্লোরিন স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়
B) ক্লোরিন পুনরায় মুক্ত হয়ে বারবার বিক্রিয়ায় অংশ নেয়
C) অক্সিজেন ধ্বংস হয়ে যায়
D) UV রশ্মি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়
উত্তর: B -
ওজোন স্তর ক্ষয় হলে প্রথমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে—
A) গভীর সমুদ্রের প্রাণী
B) ভূগর্ভস্থ জীব
C) ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন
D) আগ্নেয়গিরি
উত্তর: C) ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন -
নিচের কোনটি ওজোন স্তরের প্রধান পরিবেশগত গুরুত্ব নির্দেশ করে?
A) বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি
B) আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ
C) UV বিকিরণ থেকে জীবজগতকে রক্ষা
D) অক্সিজেন উৎপাদন
উত্তর: C) UV বিকিরণ থেকে জীবজগতকে রক্ষা