নাইট্রোজেন সনাক্তকরণ: Prussian Blue Test
রসায়ন নোট • ল্যাসেঁ পরীক্ষা দ্বারা নাইট্রোজেন সনাক্তকরণ
ল্যাসেঁ দ্রবণ (Lassaigne's Extract) থেকে নাইট্রোজেন (N) সনাক্তকরণের চূড়ান্ত পরীক্ষাটিকে বলা হয় Prussian Blue Test। নিচে এর সম্পূর্ণ ল্যাবরেটরি পদ্ধতি ও জটিল বিক্রিয়াগুলোর সহজ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. ল্যাবরেটরি পদ্ধতি (Experimental Procedure)
একটি পরিষ্কার টেস্ট টিউবে আগে থেকে তৈরি করা ল্যাসেঁ দ্রবণের (Lassaigne's Extract) কিছুটা অংশ (প্রায় ২ মিলি) নিয়ে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
ধাপ ক: ল্যাসেঁ দ্রবণের সাথে সদ্য প্রস্তুত করা (Freshly prepared) সবুজ রঙের ফেরাস সালফেট (FeSO4) দ্রবণের কয়েক ফোঁটা যোগ করা হয়।
ধাপ খ: এই মিশ্রণটিকে বার্নারের শিখায় হালকা গরম করুন বা ফুটিয়ে নিন।
ধাপ গ: এরপর মিশ্রণটিকে কিছুটা ঠাণ্ডা করে তার মধ্যে কয়েক ফোঁটা ফেরিক ক্লোরাইড (FeCl3) দ্রবণ যোগ করুন।
ধাপ ঘ: সবশেষে টেস্ট টিউবের দেওয়ালে গা বেয়ে ধীরে ধীরে গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিড (H2SO4) অথবা গাঢ় হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl) যোগ করে দ্রবণটিকে অম্লীয় করুন।
২. পর্যবেক্ষণ (Observation)
ফলাফল: গাঢ় অ্যাসিড যোগ করার সাথে সাথেই যদি টেস্ট টিউবের দ্রবণে একটি চমৎকার গাঢ় নীল বা ময়ূরকণ্ঠী নীল রঙের (Prussian Blue) অধঃক্ষেপ বা দ্রবণ তৈরি হয়, তবে বুঝতে হবে জৈব যৌগটিতে নাইট্রোজেন (N) উপস্থিত রয়েছে। (যদি নাইট্রোজেন না থাকে, তবে দ্রবণটি হালকা সবুজ বা বর্ণহীন দেখাবে)।
৩. রাসায়নিক বিক্রিয়ার সমীকরণ (Chemical Equations)
এই পরীক্ষার পেছনে মূল রসায়নটি মোট 3টি প্রধান ধাপে ঘটে থাকে:
ধাপ 1: সোডিয়াম ফেরোসায়ানাইড [Na4[Fe(CN)6]] গঠন
ল্যাসেঁ দ্রবণে থাকা সোডিয়াম সায়ানাইড (NaCN), ফেরাস সালফেটের (FeSO4) সাথে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম ফেরোসায়ানাইড তৈরি করে। এই বিক্রিয়াটি মূলত দুটি ছোট ধাপে সম্পন্ন হয়:
Step 1 : ল্যাসেঁ দ্রবণের ক্ষারীয় পরিবেশের কারণে ফেরাস সালফেট সোডিয়াম সায়ানাইডের সাথে সাধারণ প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া করে ফেরাস সায়ানাইড [Fe(CN)2] এর একটি অধঃক্ষেপ (Precipitate) তৈরি করে
Step 2: টেস্ট টিউবে ল্যাসেঁ দ্রবণের সোডিয়াম সায়ানাইড (NaCN) প্রচুর পরিমাণে (Excess) থাকে। এই অতিরিক্ত NaCN দ্রবণে থাকা Fe(CN)2-কে পুনরায় দ্রবীভূত করে ফেলে এবং একটি জটিল লবণ (Complex Salt) তৈরি করে, যা জলে সম্পূর্ণ দ্রবণীয়
Reaction 1 - প্রতিস্থাপন: FeSO4 + 2NaCN → Fe(CN)2↓ + Na2SO4
(ফেরাস সায়ানাইডের অধঃক্ষেপ তৈরি হয়)
Reaction 2 - জটিল যৌগ গঠন: Fe(CN)2 + 4NaCN → Na4[Fe(CN)6
(অতিরিক্ত NaCN-এ অধঃক্ষেপটি দ্রবীভূত হয়ে জটিল লবণ তৈরি করে)
একত্রে মূল সমীকরণটি হলো:
FeSO4 + 6NaCN → Na4[Fe(CN)6] + Na2SO4
যৌগের পরিচয় [Na4[Fe(CN)6]]: এর রাসায়নিক নাম সোডিয়াম ফেরোসায়ানাইড বা Sodium hexacyanoferrate(II)। এখানে [Fe(CN)6]4- অংশটি একটি কো-অর্ডিনেশন অ্যানায়ন। এতে আয়রনের জারণ সংখ্যা হলো +২ (ফেরাস) এবং সায়ানাইড (CN-) মূলকগুলো লিগ্যান্ড হিসেবে যুক্ত থাকে।
ধাপ ২ & ৩: প্রুশিয়ান ব্লু গঠন
যোগ করা গাঢ় অ্যাসিডের উপস্থিতিতে ভেতরের কিছু ফেরাস আয়ন (Fe2+) জারিত হয়ে ফেরিক আয়নে (Fe3+) রূপান্তরিত হয় অথবা বাইরে থেকে যোগ করা FeCl3 এই ফেরিক আয়ন সরবরাহ করে। এই ফেরিক আয়ন সোডিয়াম ফেরোসায়ানাইডের সাথে চূড়ান্ত বিক্রিয়াটি ঘটায়:
4FeCl3 + 3Na4[Fe(CN)6] → Fe4[Fe(CN)6]3↓ + 12NaCl
আয়নীয় সমীকরণ (ধাপ ৩):
4Fe3+ + 3[Fe(CN)6]4- → Fe4[Fe(CN)6]3 ↓ (Prussian Blue)
বিক্রিয়ার কৌশল (Mechanism):
এটি একটি আয়নীয় প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া। সোডিয়াম ফেরোসায়ানাইডের বাইরে থাকা 4টি Na+ আয়ন, ফেরিক ক্লোরাইড থেকে আসা Fe3+ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।
যৌগ তৈরির নিয়ম অনুযায়ী চার্জ দুটি পরস্পরের পায়ের কাছে আড়াআড়ি বসে (Cross-multiply)। ফেরিকের +3 চলে যায় থার্ড ব্র্যাকেটের বাইরে ডানদিকে এবং জটিল অ্যানায়নের -4 চলে আসে আয়রনের পায়ের কাছে। ফলে Fe4[Fe(CN)6]3 গঠিত হয়।
⚠️ একটি বিশেষ ব্যতিক্রম (Exception to Remember)
যদি কোনো জৈব যৌগে নাইট্রোজেন (N) এবং সালফার (S) উভয়ই একসাথে থাকে (যেমন: ইউরিয়া বা থায়োইউরিয়া), তবে NaCN তৈরি না হয়ে সোডিয়াম থায়োসায়ানাইড (NaSCN) তৈরি হয়।
সেক্ষেত্রে ফেরিক ক্লোরাইড (FeCl3) যোগ করলে প্রুশিয়ান ব্লু রঙের বদলে রক্তের মতো লাল রঙের (Blood Red Color) ফেরিক থায়োসায়ানাইড [Fe(SCN)3] তৈরি হয়। এটিও নাইট্রোজেনের উপস্থিতির আরেকটি বিশেষ প্রমাণ!