ল্যাসেঁ দ্রবণ (Lassaigne's Extract) তৈরির সম্পূর্ণ পদ্ধতি

রসায়ন নোট

জৈবযৌগে নাইট্রোজেন (N), সালফার (S) এবং হ্যালোজেন (Cl, Br, I) সনাক্ত করার জন্য ল্যাবরেটরিতে ল্যাসেঁ দ্রবণ (Lassaigne's Extract বা Sodium Fusion Extract) তৈরি করা হয়।

প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহ

  1. জৈবযৌগ।
  2. ধাতব সোডিয়াম (Na) এর ছোট টুকরো।
  3. সোডিয়াম ফিউশন টিউব (Sodium Fusion Tube - খুব ছোট এবং পাতলা কাঁচের নল)।
  4. চিমটা (Tongs) এবং ওয়াচ গ্লাস।
  5. Distilled water (অ্যাসিত জল) এবং একটি চিনা মাটির বাটি (Porcelain Dish)।
  6. বার্নার বা স্পিরিট ল্যাম্প।

ল্যাসেঁ দ্রবণ তৈরির ধাপসমূহ (Step-by-Step Procedure)

ধাপ ১: সোডিয়াম শুকনো করা

প্রথমে একটি ফিল্টার পেপারের সাহায্যে ধাতব সোডিয়ামের ছোট একটি টুকরোকে ভালো করে শুকিয়ে নিতে হবে (কারণ সোডিয়াম কেরোসিনে ডোবানো থাকে এবং এটি জলের সংস্পর্শে এলে বিস্ফোরণ ঘটে)।

ধাপ ২: ফিউশন টিউবে সোডিয়াম নেওয়া

শুকনো সোডিয়ামের টুকরোটিকে একটি ফিউশন টিউবের ভেতর রাখতে হবে। এবার টিউবটিকে চিমটা দিয়ে ধরে বার্নারের শিখায় হালকা উত্তপ্ত করতে হবে, যতক্ষণ না সোডিয়াম গলে একটি চকচকে রূপালী বলের মতো আকার ধারণ করে।

ধাপ ৩: জৈব যৌগ মেশানো

সোডিয়াম গলে যাওয়ার পর টিউবটিকে আগুন থেকে সরিয়ে সামান্য ঠাণ্ডা হতে দিন। এরপর তার মধ্যে সামান্য পরিমাণ (1-2 ফোঁটা তরল বা কয়েক মিলিগ্রাম কঠিন) জৈব যৌগ যোগ করুন।

ধাপ ৪: তীব্রভাবে উত্তপ্ত করা

ফিউশন টিউবটিকে আবার বার্নারের শিখায় প্রথমে ধীরে ধীরে এবং পরে খুব তীব্রভাবে উত্তপ্ত করতে হবে। টিউবের নিচের অংশটি যতক্ষণ না একদম রক্তিম লাল (Red Hot) হচ্ছে, ততক্ষণ উত্তপ্ত করতে হবে। এই সময়েই সোডিয়ামের সাথে জৈব যৌগের উপাদানগুলোর রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে।

ধাপ ৫: জলে নিমজ্জিত করা (Fusion)

একটি চিনা মাটির বাটিতে প্রায় 10-15 মিলি ডিস্টিল্ড ওয়াটার নিন। এবার ওই লাল গরম ফিউশন টিউবটিকে সরাসরি বাটির জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিন। গরম কাঁচ জলের সংস্পর্শে আসামাত্রই টিউবটি ভেঙে যাবে এবং ভেতরের বিক্রিয়াজাত পদার্থ জলে মিশে যাবে। (যদি টিউবটি নিজে থেকে না ভাঙে, তবে কাঁচদণ্ড বা গ্লাস রড দিয়ে সেটিকে গুঁড়ো করে দিতে হবে)।

ধাপ ৬: ফোটানো এবং ফিল্টার করা

চিনা মাটির বাটির মিশ্রণটিকে বার্নারের ওপর রেখে 5-10 মিনিট ভালোভাবে ফোটাতে হবে, যাতে সমস্ত দ্রবণীয় লবণ জলে সম্পূর্ণভাবে গলে যায়। ফোটানো শেষ হলে মিশ্রণটিকে ফিল্টার পেপার দিয়ে ছেঁকে নিতে হবে。

ফলাফল: এই ফিল্টার করার পর যে পরিষ্কার, বর্ণহীন তরলটি পাওয়া যায়, সেটিকেই বলা হয় ল্যাসেঁ দ্রবণ বা সোডিয়াম এক্সট্রাক্ট। এটি সামান্য ক্ষারীয় প্রকৃতির হয়।

মূল রাসায়নিক বিক্রিয়াসমূহ

তীব্র তাপে সোডিয়াম (Na) জৈব যৌগের উপাদানের সাথে যুক্ত হয়ে নিচের আয়নিক লবণগুলো তৈরি করে:

• নাইট্রোজেনের ক্ষেত্রে:
Na + C + N → NaCN (সোডিয়াম সায়ানাইড)
• সালফারের ক্ষেত্রে:
2Na + S → Na2S (সোডিয়াম সালফাইড)
• হ্যালোজেনের ক্ষেত্রে (X = Cl, Br, I):
Na + X → NaX (সোডিয়াম হ্যালাইড, যেমন: NaCl)

⚠️ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা (Precautions)

  • ১. জল থেকে সাবধান: ধাতব সোডিয়াম কাটার সময় বা ফিল্টার পেপারে শুকানোর সময় আশেপাশে যেন এক ফোঁটা জলও না থাকে। সোডিয়াম জলের সাথে অত্যন্ত তীব্রভাবে বিক্রিয়া করে আগুন ধরে যায়।
  • ২. টিউব ফাটানোর সময় সাবধান: লাল গরম ফিউশন টিউবটি যখন বাটির জলে ডোবানো হবে, তখন বাটিটিকে একটি তারজালি (Wire Gauze) দিয়ে ঢেকে রাখা ভালো, যাতে জল বা কাঁচের টুকরো छিটকে চোখে-মুখে না আসে।
  • ৩. সম্পূর্ণ দহন: ফিউশন টিউবটিকে অবশ্যই একদম রক্তিম লাল হওয়া পর্যন্ত গরম করতে হবে, তা না হলে বিক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এবং পরবর্তী পরীক্ষায় সঠিক রঙ আসবে না।

এই তৈরি করা ল্যাসেঁ দ্রবণটি দিয়েই পরবর্তীতে আলাদা আলাদা টেস্ট টিউবে নাইট্রোজেন, সালফার বা ক্লোরিন সনাক্তকরণের চূড়ান্ত পরীক্ষাগুলো করা হয়।

💡 কুইজ: নিজের প্রস্তুতি যাচাই করো

প্রশ্ন: ল্যাসেঁ দ্রবণ তৈরিতে ফিউশন টিউবটিকে বার্নারের শিখায় কেমন গরম করতে হয়?